দক্ষিণের খবর | www.dokkhinerarthonity.com
হুমকিতে জীববৈচিত্র্য
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬, ০৫:৫৪ এএম
আপডেট: মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬, ০৫:৫৪ এএম
নিজস্ব প্রতিবেদক, দক্ষিণের খবর:
বেড়েছে চায়না দুয়ারী ফাঁদে আটকা পড়ে ধ্বংস হচ্ছে দেশীয় নানা জাতের মাছ ও জলজ প্রাণী।
মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলার পদ্মা নদীসহ বিভিন্ন খাল-বিল, নদী-নালা ও জলাশয়ে নিষিদ্ধ ‘চায়না দুয়ারী’ জালের অবাধ ব্যবহার ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। প্রশাসনের চোখ ফাঁকি কিংবা রহস্যজনকভাবে দুর্বল নজরদারির সুযোগে একটি অসাধু চক্র দিন-রাত নির্বিচারে দেশীয় প্রজাতির মাছ, ডিমওয়ালা মা মাছ এবং রেণু-পোনা নিধন করে চলেছে। এতে একদিকে যেমন দেশের মূল্যবান মৎস্যসম্পদ দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে, অন্যদিকে জলজ জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্যও মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মৎস্য সুরক্ষায় প্রচলিত আইন অনুযায়ী এই জাল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও বাস্তবে এর উৎপাদন, বিক্রি ও ব্যবহার প্রায় প্রকাশ্যেই চলছে। মাঝে মধ্যে অভিযান পরিচালনা করা হলেও তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই লোকদেখানো বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেকের দাবি, অভিযানের খবর আগেই অসাধু জেলেদের কাছে পৌঁছে যাওয়ায় তারা সহজেই জাল সরিয়ে নিরাপদে সরে পড়েন। ফলে অভিযান শেষ হওয়ার পর আবারও আগের মতো শুরু হয় নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার।পদ্মা নদী থেকে শুরু করে খাল-বিলসবখানেই নিষিদ্ধ জালের বিস্তার ঘটেছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার পদ্মা নদীর বিভিন্ন পয়েন্ট ছাড়াও চরাঞ্চলের নিচু এলাকা, খাল-বিল, নদী-নালা, জলাশয় এমনকি বর্ষার পানিতে প্লাবিত কৃষিজমিতেও বাঁশ, প্লাস্টিক ও সূক্ষ্ম জাল দিয়ে তৈরি ‘চায়না দুয়ারী’ বসানো হয়েছে।বিশেষ করে পদ্মা নদীর চরজানাজাত, কাঠালবাড়ী,মাদবরচর,বন্দর খোলায় ব্যাপক পরিমাণে নিষিদ্ধ জালের বিস্তার ঘটেছে।এছাড়াও উপজেলার আড়িয়ালখা নদীর পাড় ঘেঁষে রয়েছে অসংখ্য চায়না দুয়ারী জালের বিস্তার।
এই জালের ফাঁকা অত্যন্ত ছোট হওয়ায় কোনো ধরনের মাছই বের হতে পারে না। ডিমওয়ালা মা মাছ, রেণু-পোনা, ছোট-বড় সব ধরনের মাছ এবং বিভিন্ন জলজ প্রাণী আটকা পড়ে মারা যাচ্ছে। ফলে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে এবং দেশীয় প্রজাতির অস্তিত্ব ক্রমেই সংকটাপন্ন হয়ে উঠছে।
মৎস্য সুরক্ষা ও সংরক্ষণ আইন-১৯৫০ অনুযায়ী এ ধরনের বিধ্বংসী জাল ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিন্তু বাস্তবে আইন প্রয়োগে কার্যকর তৎপরতার অভাব রয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
সচেতন নাগরিকদের ভাষ্য,সরকার প্রতিবছর মাছের উৎপাদন বৃদ্ধিতে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করছে। কিন্তু একই সময়ে যদি নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার অব্যাহত থাকে, তাহলে সরকারের সব উদ্যোগই প্রশ্নের মুখে পড়ে।তাদের মতে, শুধু অভিযান চালিয়ে জাল জব্দ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। যারা এসব জাল উৎপাদন, বাজারজাত ও ব্যবহার করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারী জালের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন বৈধ উপায়ে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করা প্রকৃত জেলেরা।স্থানীয় কয়েকজন জেলে জানান, আগে বর্ষা মৌসুমে সাধারণ জাল ফেললেই বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় মাছ পাওয়া যেত। কিন্তু এখন অসাধু জেলেরা চায়না দুয়ারী দিয়ে অল্প সময়েই বিপুল পরিমাণ মাছ ধরে ফেলায় নদী ও খাল-বিলে মাছের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।তাদের অভিযোগ, বৈধ জাল ব্যবহার করে এখন আর আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না। ফলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
উপজেলার কাঠালবাড়ী এলাকার বাসিন্দা জালাল মিয়া বলেন,আগে বর্ষা এলেই খাল-বিলে প্রচুর দেশীয় মাছ পাওয়া যেত। এখন চায়না দুয়ারীর কারণে মাছ প্রায় বিলুপ্তির পথে। প্রশাসনের আরও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
মাদবরের চর ইউনিয়নের বাসিন্দা দেলোয়ার মিয়া বলেন,সরকার মাছের উৎপাদন বাড়াতে নানা উদ্যোগ নিচ্ছে। কিন্তু নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারী বন্ধ না হলে সেই উদ্যোগের সুফল মিলবে না। শুধু অভিযান চালালেই হবে না, যারা বারবার এই জাল ব্যবহার করছে তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মৎস্যজীবী বলেন,চায়না দুয়ারী জাল সহজে নষ্ট হয় না, দীর্ঘদিন পানিতে রেখে মাছ ধরা যায়। দামও কম, তাই অনেকে এটি ব্যবহার করছে। বিভিন্ন দোকানে সহজে পাওয়া যাওয়ায় এর ব্যবহার বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, একসময় পদ্মা নদী ও আশপাশের খাল-বিলে প্রচুর দেশীয় মিঠাপানির মাছ পাওয়া যেত। জলবায়ু পরিবর্তন, খাল-বিল ভরাট, অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার,নদীর নাব্যতা সংকট এবং মাছের প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংসের কারণে এমনিতেই দেশীয় মাছের সংখ্যা কমে যাচ্ছে।এর সঙ্গে নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারী জালের ব্যাপক ব্যবহার যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। এই জাল শুধু মাছই নয়, বিভিন্ন জলজ প্রাণী ও উপকারী জীবও ধ্বংস করছে। এতে পুরো জলজ বাস্তুতন্ত্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে অনেক দেশীয় মাছ বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে, যা খাদ্য নিরাপত্তা,পুষ্টি এবং পরিবেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি হুমকি সৃষ্টি করবে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে গোপনে নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারী জাল বিক্রি হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃশ্যমান পদক্ষেপ খুব একটা চোখে পড়ে না।তাদের মতে, নিয়মিত অভিযান, বাজারে নজরদারি, উৎপাদন ও বিপণন বন্ধ এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় না আনলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না।
এ বিষয়ে শিবচর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সত্যজিৎ মজুমদার বলেন, 'আমাদের লোকবল সংকটের কারণে আমরা ঠিকভাবে অভিযান পরিচালনা করতে পারছি না।তবে এর মাঝেও আমরা বেশ কয়েকটি অভিযান পরিচালনা করেছি। নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারীর অপসারণ করা হচ্ছে। আমরা ভবিষ্যতে এই অভিযান আরও জোরদার করবো। জলজ সম্পদ সংরক্ষণ এবং দেশীয় মাছের উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে মৎস্য সুরক্ষা ও সংরক্ষণ আইন-১৯৫০ অনুযায়ী মোবাইল কোর্ট পরিচালনা বৃদ্ধিসহ প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'
প্রকাশক ও প্রধান সম্পাদক: মো. সরোয়ার হোসেন মিঠু
নির্বাহী সম্পাদক: ইমতিয়াজ আহমেদ
বার্তা সম্পাদক: নাজমুল হোসেন লাভলু
ডিজিটাল ইনচার্জ: মো.সোবাহান মিয়া
Email: dokkhinerkhobor@gmail.com
Publisher & Editor In Chief:
Contact No:+880 1717607442
Address: Shibchar Powro Super Market, 2nd Flor, Shop No.44, Shibchar Sadar, Madaripur.
স্বত্ব দক্ষিণের খবর
Developed by Vida Team